“রক্ষক যখন ভক্ষক হয়”—এই প্রবাদটি সমাজে এমন একটি চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে, যেখানে যারা আইন বা নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত, তারাই যখন অপরাধ বা শোষণের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। তখন ভেঙে পড়ে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আর অসহায়ত্ব পৌঁছে যায় চরম পর্যায়ে।
ঠিক তদ্রুপ, গত তিন মাসে বাগানবাজার ইউনিয়নে মাদক নিয়ে এতো এতো সমালোচনা ও অভিযোগ তোলার পরও—নীতি-নির্ধারকদের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নজরে পড়ছে না।
যাদেরকে বাগানবাজারের জনগণ একটি সুন্দর আগামীর অভিভাবক হিসেবে দেখছে, ভাবছে—তারাই কি না মাদকের সেল্টারদাতা বা কমিশনভিত্তিক ব্যবসায়িক পার্টনার! এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে।
গত কয়েক মাসে “বাগানবাজার গ্রাফ” মাদককারবারীদের নিয়ে যতগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, কিংবা অনুসন্ধান করে আসছে—বারবার কয়েকটি নাম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উঠে আসছে। তাহারা হচ্ছে—আবু মেম্বার, মহিউদ্দিন, লোকমান, জসিম মেম্বার ও কাসেম মেম্বার।
আবু মেম্বার:
তিনি বাগানবাজার বিএনপির একজন উপদেষ্টা। পাশাপাশি তার ভাই মনিরুল ইসলাম বাগানবাজার ইউনিয়ন বিএনপির একজন সহ-সভাপতি। এক কথায় বলা যায়—ইউনিয়ন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় পদগুলোর দুটিই তার হাতে। ফলে দলীয় সিনিয়র নেতা হিসেবে সমাজ কিংবা দলীয় কোরামে রয়েছে তার বিশেষ গুরুত্ব।
সেই সম্মান ও গুরুত্বকে ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেছেন বাগমারা, লালমাই, বড়বিল ও হলুদিয়াসহ কয়েকটি গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব—এমন অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে সালিশ বাণিজ্য ও মাদকের সেল্টারদাতাসহ বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়াও বাগমারা, লালমাই, বড়বিল ও হলুদিয়াসহ কয়েকটি গ্রামে মাদকের সাপ্লাইয়ের অধিকাংশ সেল্টার দাতা হিসেবে তার ও তার ভাই মনিরের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
মহিউদ্দিন:
ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন শিক্ষিত রাজনীতিবিদ। তিনি ফটিকছড়ি উপজেলার যুবদলের সদস্য। লোকমান থানা যুবদলের জয়েন্ট সেক্রেটারি। পাশের ইউনিয়ন দাঁতমারার একরামুল হক একরাম থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। একই সাথে শাকিল চৌধুরী রনি—যিনি বিপ্লবের ভাতিজা ও থানা যুবদলের সহ-সভাপতি।
যুবদলের এই সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মহিউদ্দিনের প্রভাববলয়—যা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে এলাকায়।
এতো রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি, মহিউদ্দিনের সাথে ফটিকছড়ি-২ এর নির্বাচিত সংসদ সদস্যের গভীর সখ্যতার কথাও আলোচিত। যেখানে তিনি আগামীর বাগানবাজারের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য সমর্থন পেয়ে যাচ্ছেন—এমন ধারণাও প্রচলিত।
যেখানে মহিউদ্দিন ও লোকমানের প্রভাব একই লাইনে এসে দাঁড়ায়— যেখানে মহিউদ্দিনকে স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন, সেখানে স্থানীয় নেতা-কর্মী বা মাদককারবারীদের তাকে ম্যানেজ করা ছাড়া ব্যবসা করা সম্ভব না—এই ধারণাটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।সেজন্য জসিম মেম্বার ও কাসেম মেম্বারও নাম লিখিয়েছেন মহিউদ্দিনের শীর্ষদের তালিকায়—এমন কথাও শোনা যায়।
জসিম মেম্বার:
বাগানবাজার বিএনপির সদস্য সচিব। যিনি সিনিয়রদের সিনিয়র—এক কথায়, বাগানবাজারের “অঘোষিত চেয়ারম্যান” বলা যায়। তার কাছে রয়েছে পুরো বাগানবাজারকে নিজের মতো করে সাজানোর সক্ষমতা।
কিন্তু তিনি সেটি না করে, তার ওয়ার্ডকে তৈরি করেছেন বাগানবাজারের একটি বড় অঙ্গরাজ্য—এমন অভিযোগ রয়েছে। যেখানে তার ওয়ার্ডের বড় একটি অংশ মাদকের ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়।
সীমান্তের রাজা বাবলু—জসিম মেম্বারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। বাবলু আওয়ামী লীগের শাসনামলে দাঁতমারা ইউনিয়নের আলী আক্কাস ভুট্টোর ছেলেদের মাধ্যমে মাদকের ব্যবসা করে গেছে। সরকার পরিবর্তনের পর জসিম মেম্বার ও দাঁতমারা ইউনিয়নের শাকিল চৌধুরী রনির সাথে একই সমীকরণে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে—এমন কথাও প্রচলিত। এই একই সমীকরণে—পিছিয়ে নেই নেজামও।
এছাড়াও জসিম মেম্বারের পুরো মাদক ব্যবসায় রয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ডভিত্তিক সীমান্ত পার্টনারশিপ। যাদের আমরা “ক্লিন ইমেজ”-এর রাজনীতিবিদ হিসেবে চিনি। এই ক্লিন ইমেজের আড়াল ব্যবহার করেই জসিম তৈরি করেছে চেয়ারম্যান নির্বাচনের ওয়ার্ডভিত্তিক ফিল্ড—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে।
কাসেম মেম্বার:
তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার। পাশাপাশি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। একজন ওয়ার্ড মেম্বার ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রভাব রয়েছে।
সে ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূর-নবী—যিনি ফটিকছড়ি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক—তার সাথে সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাসেম মেম্বার, নূর-নবী ও লোকমানের পার্টনারশিপে তৈরি হয়েছে একটি মাদকের প্রভাববলয়—যেখানে শাকিল চৌধুরী রনি ও একরামুল হক একরামের সঙ্গবদ্ধ সিন্ডিকেটও সক্রিয়।
শাকিল চৌধুরী রনি ও একরামের সিন্ডিকেট সবার কেন প্রয়োজন ?
বাগানবাজারের মাদকের চালান হেয়াকো ও দাঁতমারা মেইন রোড হয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা পেরিয়ে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে—এমনটাই জানা যায়।
এই চালানের সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে স্থানীয় নেতাকর্মীরাই। কারণ, এগুলো আটকানো কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মূলত তাদের হাতেই।
৫ আগস্টের পূর্বে হেয়াকো ও দাঁতমারা রুটের নিয়ন্ত্রণ ছিল মজিবুল হক কোম্পানির ছেলে রুবেল মজুমদারের হাতে। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নিয়ন্ত্রণ চলে যায় শাকিল চৌধুরী রনির হাতে।
শান্তিরহাটে একরাম উদ্দিনের এলাকা হওয়ায়, সেই অঞ্চলেও তার শক্ত প্রভাব রয়েছে । স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক পদ-পদবি—সব মিলিয়ে তার হাতেও রয়েছে পুরো মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ—এমন কথাও এলাকাজুড়ে শোনা যায়।
যদিও যাদের নামে অভিযোগ তাহারা বারবার একটি উত্তর-ই দেয়- তাহারা জানেন না কাহারা মাদক ব্যবসায়ীদের সেল্টার দেয়। প্রকৃতপক্ষে তারাই মাদকের সেল্টারদাতা হিসেবে আলোচিত। তাই তো মাদক বিরোধী সমাবেশের ডাক দিয়ে চুপ হয়ে গেলেন বাগানবাজার বিএনপির সদস্য সচিব জসিম মেম্বার। যখন জনগণের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে- ‘শুধু মাদকবিরোধী সমাবেশ করলেই হবে না, পাশপাশি মাদককারবারীদের তালিকাও প্রকাশ করতে হবে।’ তখনই নীরব হয়ে যান জসিম মেম্বার।
এটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি হিসেবে দেখছেন। স্থানীরা মনে করছেন, নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে যারা মাদকের সেল্টার দিচ্ছে তারাই মাদক বিরোধী সমাবেশের ডাক দিবেন জনগনের আই-ওয়াস করার জন্য।
বাগানবাজারের বর্তমান বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে— যাদের বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ না করার বা সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে, তারাই কি আগামী দিনের নেতৃত্বে আসবে?
যদি সত্যিই তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে, তবে এই নিষ্ক্রিয়তা নিজেই একটি বড় প্রশ্ন। আর যদি সেই প্রশ্নের উত্তর না মেলে—তাহলে ভোটের সময় জনগণের সিদ্ধান্তই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাব।
সহজ ভাষায়—আজকের নীরবতা কালকের নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে। যাদের দিকে আজ আঙুল উঠছে—কাল কি তাদের হাতেই আবার বাগানবাজারের দায়িত্ব যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন বাগানবাজারের মানুষের হাতেই।
ক্ষমতা যাদের হাতে, নিয়ন্ত্রণও যদি তাদের হাতেই থাকে—তাহলে প্রশ্ন একটাই: তারা কি বাগানবাজারকে বাঁচাবে, নাকি এই নীরবতার আড়ালেই চলবে তার ধ্বংস।