সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট না দিলে কিংবা কোনো বিষয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম না হলে যেন মানুষ তাদের ন্যায্য বিচার পায় না—ঠিক এমন বাস্তবতাই বর্তমানে দেখা যাচ্ছে বাগানবাজার ইউনিয়নে। গত কয়েক মাস ধরে বাগানবাজারের সাধারণ মানুষ বিচারহীনতার অভিযোগ তুলে আসছেন। অনেকের মতে, কোনো ঘটনা যখন মিডিয়ার হেডলাইন হয় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়, তখনই কেবল নীতি-নির্ধারকেরা নড়েচড়ে বসেন।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে অনুসন্ধানী ভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাগানবাজার গ্রাফ বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান শুরু করে। সেই প্রেক্ষাপটে আমরা ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি এবং তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেছি।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে যারা সালিশ-বিচার পরিচালনা করছেন তাদের অনেকেরই এই দায়িত্ব পালনের মতো পর্যাপ্ত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা নেই। তাদের মতে, যাদের এই বিচার ব্যবস্থায় বসার কথা, তাদের অনেককেই এখানে দেখা যায় না; বরং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অন্যরা এসব স্থানে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। অথচ সামাজিক বিচার ব্যবস্থার কাঠামো এমন হওয়ার কথা নয়।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে গুরুত্ব নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, কার সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাব কতটুকু, তার উপর নির্ভর করেই অনেক সময় বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অনেকের অভিযোগ, নীতি-নির্ধারকদের আন্তরিকতার অভাবও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এবং কয়েকটি সালিশ-বিচার পর্যবেক্ষণ করে আমাদের অনুসন্ধানে একটি গুরুতর সমস্যা সামনে এসেছে। সেটি হলো সালিশ বাণিজ্য।
স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকে বাগানবাজারে যে সালিশ-বিচারগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তার অধিকাংশই ঘটেছে ৭ নম্বর ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। আর এই ওয়ার্ডগুলোর নীতি-নির্ধারণী ভূমিকায় রয়েছেন, কাসেম মেম্বার, জসিম মেম্বার এবং যুবদল নেতা লোকমান।
আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে যে ৭ নম্বর ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকাংশ সালিশ-বিচার কাসেম, জসিম ও লোকমানের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে লোকমান বিচার শুরু হওয়ার আগেই ভুক্তভোগীদের এক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। কখনো কখনো তাদের দেওয়া রায় ভুক্তভোগীরা মেনে না নিলে দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে হামলার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডে কাসেম মেম্বার ও জসিম মেম্বারও পিছিয়ে নেই-এমন অভিযোগও উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। তাদের ভাষ্যমতে, গত এক বছরে বাগানবাজারের সালিশ-বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় গত এক বছরে শক্ত বা কার্যকর কোনো সালিশ-বিচার চোখে পড়ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এমন রায় দেওয়া হয় যেখানে প্রকৃত অন্যায়কারীকে নামমাত্র শাস্তি দেওয়া হয়। ফলে দেখা যায়, বিচার হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সেই ব্যক্তি আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
আমাদের কাছে ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে দুটি পৃথক অভিযোগ এসেছে, যেগুলো উভয়ই সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে। একটি ঘটনায় অভিযোগ করা হয়েছে, এক ভুক্তভোগী কাসেম মেম্বারের দেওয়া বিচার মানতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর কাসেম মেম্বারের নির্দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে আরেক ভুক্তভোগী লোকমান, কাসেম মেম্বার ও জসিমের দেওয়া রায় মানতে না চাইলে জসিমের সহযোগী মনিরের নেতৃত্বে তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও স্থানীয়দের দাবি, পরকীয়া, সম্পত্তি বিরোধ এবং দাম্পত্য কলহের মতো বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে টার্গেট করে এই পক্ষগুলো সালিশের প্রতি আগ্রহ দেখায়। কারণ এই ধরনের সমস্যায় তুলনামূলক বেশি পরিমাণ জরিমানা আদায় করা সম্ভব হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের সালিশে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে এক লাখ টাকারও বেশি জরিমানা ধার্য করা হয়। আর এই অর্থ সাধারণত যুবদল নেতা লোকমানের মাধ্যমেই আদায় করা হয়।
আমাদের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মুহাম্মদপুর সমাজে যে সালিশ-বিচার হয়েছে সেখানে প্রায় দুই লাখ টাকা জরিমানা আদায় হওয়ার কথা ছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী এই অর্থ সমাজের কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে এক লাখ টাকাও জমা পড়েনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বাকি অর্থ কোথায় গেল?
বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভিন্ন সমাজের সর্দারদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা জানান, সামাজিক বিচার যেভাবে হওয়ার কথা, বর্তমানে তা সেভাবে হচ্ছে না। তাদের ভাষ্যমতে, “আমাদেরও অনেক ক্ষেত্রে কিছু করার থাকে না। কারণ ভুক্তভোগীরা প্রথমে অভিযোগ নিয়ে যান মেম্বার বা চেয়ারম্যানের কাছে। তারা যদি আমাদের বিষয়টি জানান, তখন আমরা সালিশে অংশ নিই। কিন্তু বাস্তবে প্রক্রিয়াটি ভিন্ন হওয়ার কথা।”
তাদের মতে, সামাজিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রথমে পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। সেখানে সমাধান না হলে সমাজের নীতি-নির্ধারকদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা হওয়া দরকার। সরাসরি মেম্বার বা চেয়ারম্যানের কাছে বিচার নেওয়া অনেকটা আইন আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার মতোই। কারণ এখানে যেমন অর্থ ব্যয় ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে, আদালতেও তেমনি প্রক্রিয়া রয়েছে—তবে আদালতের রায় অধিকতর স্থায়ী ও টেকসই সমাধান দেয়।
সর্দারদের মতে, সালিশ-বিচারে যে জরিমানা আদায় করা হয়, তা অনেক সময় সালিশকারীদের ব্যক্তিগত আয়ের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। অথচ প্রকৃতপক্ষে এই অর্থ সমাজের কোষাগারে জমা হলে সেই অর্থ দিয়ে সমাজের ছোটখাটো সমস্যাগুলো সহজেই সমাধান করা যেত। তখন জনপ্রতিনিধিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না।
আমাদের অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে পারিবারিক কলহ বা দাম্পত্য বিরোধ সংক্রান্ত সালিশ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় সমঝোতার চেষ্টা না করে দ্রুত বিচ্ছেদের দিকে রায় দেওয়া হয়। বিচ্ছেদের পর কাবিনের টাকা আদান-প্রদানের দায়িত্ব নেন লোকমান। অভিযোগ অনুযায়ী, এক পক্ষ লোকমানকে পুরো অর্থ পরিশোধ করলেও অন্য পক্ষ অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থ সম্পূর্ণভাবে পায় না। পাশাপাশি ওই অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগীদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর থেকে লোকমানের আর্থিক অবস্থায় হঠাৎ করেই বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তাদের ভাষ্যমতে, আগে লোকমান টাকার অভাবে ধূমপান পর্যন্ত করতে পারতেন না; অথচ এখন তিনি প্রায় তিন লাখ টাকার মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন এবং তার বাড়িতে নির্মাণ হচ্ছে ইট-সিমেন্টের বড় বাড়ি। এছাড়াও সালিশ বাণিজ্যের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, জায়গা দখল ও চাঁদাবাজিরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। লোকমানের রয়েছে একাধিক সন্ত্রাসবাহিনী।
এ বিষয়ে ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, অভিযোগগুলো অনেকাংশে সত্য হলেও তা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। তিনি বলেন—
১. কোনো জনপ্রতিনিধি এককভাবে বিচার করতে পারবেন না। প্রতিটি ওয়ার্ডে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য—রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক—ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বিচারিক টিম গঠন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না; বিচারিক টিমের সদস্যদের কোরামের ভিত্তিতে রায় দিতে হবে।
২. বিচার সংক্রান্ত কোনো অর্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে দেওয়া যাবে না।
এ বিষয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আবুল হাসেম বলেন, বাগানবাজার ইউনিয়নের বিচার ব্যবস্থায় বর্তমানে যে ‘সালিশ বাণিজ্য’ আর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিচারের নামে অর্থ আত্মসাৎ, বিচ্ছেকে উসকে দেওয়া কিংবা অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমি মনে করি, সমাজের বিচার ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পকেটবন্দি হওয়া উচিত নয়; বরং এটি হওয়া উচিত স্বচ্ছ এবং ন্যায়ভিত্তিক।
ইনশাআল্লাহ্, সুযোগ পেলে আমি প্রতিটি ওয়ার্ডে অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে ‘তদারকি কমিটি’ গঠন করব এবং জরিমানার প্রতিটি পয়সা সমাজের তহবিলে জমা নিশ্চিত করব। অতিতেও আমি তাই করেছি। সাধারণ মানুষের হক আর ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য। ইনশাআল্লাহ্, ইউনিয়ন হবে সবার জন্য নিরাপদ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক।
এই বিষয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলম মাসুদ বলেন, প্রথানুযায়ী গ্রামের সর্দার সালিশ বিচার করেন।একজন সর্দারও একটা সমাজের নির্বাচিত প্রতিনিধি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও সালিশ বিচার করেন নির্বাচনী এলাকায়। ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম আদালতের এখতিয়ারাধিন অপরাধ বিচার করেন। এর বাহিরে যা কিছু হচ্ছে তা আইনসম্মত নয়।
তবে শুধু আপস করার নিমিত্তে ছোটখাটো অপরাধ নিয়ে যে কেউ বসতে পারে এবং আপসও করতে পারে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আদালত পর্যন্ত না আসাই শ্রেয়। গ্রাম আদালতের বাহিরে স্থানীয় কারো এখতিয়ার নেই জরিমানা করার। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিচার আমি সমর্থন করি না। বে আইনীভাবে জরিমানা করে তা আবার নিজেরা ভাগাভাগি করে নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। গ্রামে সালিশ বিচার করা রাজনৈতিক নেতাদের কাজ নয়। বিচারের নামে পক্ষপাতিত্ব করে সমাজে বিচারহীনতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি একধরনের অপরাধ।