২৭ মার্চ, শুক্রবার।
মসজিদে এশার আজান ভেসে আসছে- ধীরে, গা ছমছমে এক আহ্বান। মুসল্লিরা একে একে ভেতরে ঢুকছে, কেউ অজু করছে, কেউ ইতিমধ্যেই সিজদায় মাথা নত করেছে। চারপাশে এক ধরনের পবিত্র নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতার নিচে যেন অদৃশ্য কিছু চাপা পড়ে আছে।
জাহিদ খন্দকারও মসজিদের দিকে এগুচ্ছে। মাথা নিচু, পা দ্রুত- মনে শুধু নামাজ। ঠিক সেই সময়, হঠাৎ করে অন্ধকার চিরে একটা বাইকের হেডলাইট তার চোখে এসে পড়ে। ব্রেকের তীক্ষ্ণ শব্দ। সামনে এসে দাঁড়ায় থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক- লোকমান।
বাইকটা থামতেই বাতাস বদলে যায়।
লোকমানঃ এই তুই “গ্রাফ”-র এডমিন? তুই কমেন্ট কইচ্ছোস কিল্লাই?
জাহিদঃ আমি তো ভাই কোনো কমেন্ট করি নাই।
লোকমানঃ তুই এডমিন এই দেখ ফেসুবকে তোর ছবি।
লোকমান ফোনটা সামনে ধরে। স্ক্রিনে ঝলসে ওঠা ছবিটা- জাহিদেরই।
(এখানে গকতাল সেই জুলাই যুদ্ধা, কেন্দ্রিয় নেতা খ্যাত জসিম “গ্রাফ”-র এডমিন সন্দেহ অনেকের নাম প্রকাশ করে। এই সন্দেহের ছায়া অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, আর আজ সেটা এসে থেমেছে জাহিদের সামনে।)
জাহিদঃ এইটা তো জসিম আমাকে সন্দেহ করে ছবি দিছে কিন্তু আমি তো কোন কিছু লিখি নাই।
তার কণ্ঠে আতঙ্ক চাপা, কিন্তু চোখে ধরা পড়ে অস্বস্তি।
এরই মধ্যে আরেকটা বাইক এসে থামে। লোকমানের ভাই দুলাল( মাদককারবারী), সাথে করিম( মাদককারবারী ও তার ভাই) । তাদের চোখে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা।
লোকমানঃ তুই হোন্ডাত উঠ।
জাহিদঃ কেনো? আমি নামজ পড়বো। আমি নামাজের পর এখানে আছি, নামাজের পর আপনাদের সাথে কথা বলবো। নামাজের সময় চলে যাচ্ছে।
লোকমানঃ তুই চিয়নচরা যাই নজ হরিস।
জাহিদঃ না আমি এখানেই পড়বো।
লোকমানঃ কলনির মসিদ আছে, হেনো হরিস।
কথাগুলো আর শুধু কথা থাকে না- ধীরে ধীরে হুমকিতে পরিণত হয়।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুলাল আর করিম তাকে ঘিরে ফেলে। জোর না করেও জোরের একটা উপস্থিতি থাকে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কলনির দিকে- অন্ধকার গলির ভেতর, যেখানে আলো ঢোকে কম, আর প্রশ্ন বেশি।
সেখানে গিয়ে তার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। স্ক্রিন স্ক্রল হয় দ্রুত, চোখগুলো আরও দ্রুত।
এই সময় তাদের সাথে যোগ দেয় নবী( মাদককারবারী ও তার ভাই) – আরেকজন, একই চক্রের মানুষ।
জাহিদ কাঁপা গলায় বলে-
“দেখেন, এইটা আমি চালাইনা, এই যে আপনি আমাকে এখানে এনেছেন এইটা তাদের নিকট খবর চলে গিয়েছে, আপনরা সাথের কেউ হয়তো তাদের সোর্সও আছে যেটা আমি আপনি জানিনা । তাদের নিদিষ্ট কোনো লোক নাই। তারা সবাইর সাথে যুক্ত। আপনি ভালোভাবে তাদের ঘাটাঘাটি করুন। ”
লোকমান হেসে ওঠে- একটা ঠান্ডা, অদ্ভুত হাসি।
লোকমানঃ হ হ হ ইয়ান চলি গেছে হে*ডার গ্রাফ এর কাছে। ইয়ান আই মানি। তোরা তিনজন এইডার লগে জড়িত।
তারপর সে আরও দুজনের নাম নেয়- অন্ধকারে আরও ছায়া খোঁজে।
জাহিদ এবার একটু জোরে বলে-
“আপনি যাদের নাম বলেছেন তারা তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে খুবই ব্যস্ত এসব লোক এগুলোর চালানো নিয়ে সময় নেই।”
কথাটা বাতাসে ঝুলে থাকে।
ঠিক তখনই- লোকমানের মোবাইলে একটা কল আসে।
সবকিছু থেমে যায়।
নীরবতা।
লোকমান ফোন ধরে, কিছু শোনে- তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। আগের সেই আগ্রাসন হঠাৎ কোথাও গা ঢাকা দেয়।
কল শেষ হতেই সে ধীরে বলে-
“দেখ আই সামনে মেম্বর ইলেকশন করমু, হিল্লাই আর হিছনে তোরা লাইগজস। আই এগিন করি যে, লেহন লাগে নি?”
কথাগুলো হুমকি না, না কি সতর্কতা- বোঝা কঠিন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন- ওরা তাকে এনেছিল হাত-পা ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে। সুযোগ পেলে যাচাই না করেই মারতো। তখন লোকমান আর দুলাল- দুই ভাই-ই মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিল।
কিন্তু সেই ফোনকল- কিছু একটা বদলে দেয়।
কিছুক্ষণ পর, একইভাবে হঠাৎ করে, তারা জাহিদকে বাজারে এনে নামিয়ে দেয়।
চারপাশে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে আসে।
শুধু জাহিদের ভেতরে থেকে যায়- একটা অদৃশ্য ভয়, আর একটা প্রশ্ন-
ওই ফোনকলের ওপাশে কে ছিল?
এই ব্যাপারে ফটিকছড়ি উপজেলার স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এড. ইউসুফ আলম মাসুদ বলেন- যদি সত্যি হয় নিন্দনীয়! শুধু নিন্দনীয় নয় আইনে সুনির্দিষ্ট অপরাধ। অতীতে কন্ঠ রোধের এমন অপচেষ্টা আমরা বাগান বাজারবাসী দেখেছি। ৫ আগস্টের পর পুনরাবৃত্তি আমাদের জন্য লজ্জার। ঘটনা সত্যি হলে আমি ভিকটিমের পক্ষে আছি।