৭নং ওয়ার্ডের রাজনীতির এক পুরনো গল্প আজ আবার নতুন করে ভাবাচ্ছে, আর সেই ভাবনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মাজুরা জাহাঙ্গীর একসময় রুস্তম চেয়ারম্যানকে বলেছিলেন—নির্বাচনে কে জিতবে জানা নেই, কিন্তু আমি ৬০০ ভোট পাবো এইটা নিশ্চিত; কথাটা তখন হয়তো আত্মবিশ্বাস মনে হয়েছিল, কিন্তু আজ সেটা একটা হিসাবি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই বেশি চোখে পড়ে।
প্রশ্ন ছিল—কিভাবে নিশ্চিত? উত্তর ছিল আরও স্পষ্ট—বাগানবাজারের গুন্ডা, মাস্তান, চাঁদাবাজ, জুয়ারি, মাদকসংশ্লিষ্ট মানুষ—সবাই তার প্রভাবে; এই উত্তর শুধু একজন মানুষের শক্তির কথা বলে না, বরং একটা অদৃশ্য ভোটব্যাংকের বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। তখন হয়তো বিষয়টা গল্প ছিল, কিন্তু এখন অনেকের রাজনীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে—যেখানে নীতি নয়, নিয়ন্ত্রণই মূল শক্তি।
আজকের বাগানবাজারে এসে দেখা যায়, কিছু নেতা মানুষের ভালোবাসার চেয়ে নিশ্চিত ভোটকে বেশি গুরুত্ব দেন, আর সেই নিশ্চিত ভোটের বড় অংশটাই আসে বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলো থেকে; এটা কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, বাস্তবতা নিজেই নিজের সাক্ষ্য দেয়। বলা হয়, ৮০% নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে জড়িত—সংখ্যাটা বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু পরিবেশটা অস্বীকার করার মতো না।
অন্যদিকে যে ২০% এখনো সরাসরি জড়িত নয়, তারা আছে কিন্তু নীরব, তারা বোঝে কিন্তু বলে না, তারা দেখে কিন্তু দাঁড়াতে পারে না; কারণ সংখ্যার বিপরীতে দাঁড়ানো সবসময়ই কঠিন, আর প্রভাবের বিপরীতে কথা বলা আরও কঠিন। এই নীরবতাই ধীরে ধীরে ভুলকে স্বাভাবিক করে তোলে, আর স্বাভাবিকতাই একসময় সত্যি মনে হতে শুরু করে।
এখানেই আসে মূল প্রশ্ন—আমরা কি সেই রাজনীতিকে মেনে নেবো, যেখানে মাদককারবারীরা সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়ে নির্বাচনের পর আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়? নাকি আমরা এমন নেতৃত্ব চাইবো, যারা সাময়িক পরিবর্তনের গল্প না বলে দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতার প্রমাণ দেয়? কারণ ইতিহাস বলে, ক্ষমতা শুধু মানুষকে বদলায় না—অনেক সময় মানুষকেই তার আসল রূপে ফিরিয়ে আনে।
তাই বিষয়টা শুধু একজন প্রার্থীকে নিয়ে না, বিষয়টা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ে; আমরা কি সংখ্যার দিকে তাকাবো, নাকি চরিত্রের দিকে তাকাবো—সেটাই আসল সিদ্ধান্ত। গ্রামের সেই কথাটাই আবার মনে পড়ে—“দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো”; কারণ খারাপকে সঙ্গে নিয়ে এগোনোর চেয়ে একা সৎ থাকা অনেক সময় বেশি শক্তিশালী অবস্থান।
শেষ পর্যন্ত, নির্বাচন শুধু ফলাফল না, এটা একটা বার্তা; আমরা কাকে জেতাচ্ছি তার চেয়েও বড় কথা—আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাইছি।