বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
মাদক ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ওয়েলকাম টু ওয়ার্ড ৭: সার্ভেন্টস ইন ডিসগাইজ

বাগানবাজার গ্রাফ নিউজ ডেস্ক

গত ৮ই মার্চ “বাগানবাজার গ্রাফ”-এর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ আসে। অভিযোগে বলা হয়, বাগানবাজার এলাকায় মাদকের বড় একটি অংশের চালান আধারমানিক রাস্তার মাথার বাজার হয়ে বের হয়। এই বাজারটি মূলত ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দাদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এর ভৌগোলিক অবস্থানও কৌশলগত—একদিকে পানুয়া সীমান্তের সড়ক, অন্যদিকে আধারমানিক সীমান্তের সড়ক। এই দুই সীমান্তপথকে ঘিরেই মাদক চক্রগুলো বাজারটিকে তাদের প্রভাব বিস্তারের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাগানবাজারের মাদক বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মহিউদ্দিন, জসিম মেম্বার, নেজাম ও লোকমান। তাদের সহযোগী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে সুমন (ডাইল সুমন নামে পরিচিত), নাজমুল, মনির, বাবলু, ইকবাল, সুমন মজুমদার, জাহাঙ্গীর আলম ও মহসিন। স্থানীয়ভাবে তাদেরকে জসিম মেম্বার ও নেজামের নিয়ন্ত্রিত মাদক নেটওয়ার্কের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে “বাগানবাজার গ্রাফ” একটি অনুসন্ধান পরিচালনা করে। জানা যায়, প্রায় ৪০ হাজার ভোটারের এই এলাকায় সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১০০০ জন মানুষ, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনুসারী। যদি এই সংখ্যাকে দুই দলে ভাগ করা হয়, তবে প্রতিটি দলে গড়ে প্রায় ৫০০ জন কর্মী থাকার কথা। বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিকে বিবেচনা করলে তাদের কর্মীসংখ্যা আনুমানিক ৮০০।

এই ৮০০ কর্মীকে ৯টি ওয়ার্ডে সমানভাবে ভাগ করলে প্রতি ওয়ার্ডে প্রায় ৮৯ জন করে কর্মী থাকার কথা। সেই হিসেবে আধারমানিক রাস্তার মাথা এলাকায় কাসেম মেম্বার, জসিম মেম্বার, নেজাম ও লোকমান—এই চার নেতার অধীনে প্রায় ২৩ জন কর্মী থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শুধুমাত্র ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর ও আঁধারমানিক গ্রামেই সক্রিয় রয়েছে প্রায় ৪৫ জন মাদককারবারী, যাদের নিয়ন্ত্রণ করে নেজাম ও জসিম মেম্বার। এরা সবাই তাদের দলীয় কর্মী।

নেজাম আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে মেম্বার পদে এবং জসিম মেম্বার চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, নেজাম ৫ই আগস্টের পর প্রবাস জীবন ছেড়ে দুবাই থেকে দেশে ফিরে আসেন মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে। তার অধীনে প্রায় ৪০ জন কর্মী রয়েছে, যারা সরাসরি তার আশ্রয়ে আধারমানিক ও শান্তিনগর এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে বা সীমান্ত থেকে মাদক বহন করে আনে।

আধারমানিক গ্রামে নেজামের একটি মাদক গুদাম রয়েছে, যা তিনি তার ব্যক্তিগত অফিস হিসেবে দাবি করেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে বাবলু, ইকবাল এবং আমজাদ হোসেন সুমন।

আমজাদ হোসেন সুমন বিদেশ (কলোম্বিয়া) থেকে দেশে ফিরে নেজামের সঙ্গে এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন বলে জানা যায়। অন্যদিকে বাবলু, যিনি একসময় আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন, ৫ই আগস্টের পর বিএনপির সক্রিয় কর্মীতে পরিণত হন। স্থানীয়দের কাছে বাবলু আধারমানিক গ্রামের মাদক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।

বাবলুর নিজস্ব একটি কর্মী বাহিনী রয়েছে, যারা একই সঙ্গে জসিম মেম্বার ও নেজামের পক্ষেও কাজ করে। তাদের প্রধান দায়িত্ব সীমান্তের একপাশ থেকে অন্যপাশে মাদক পরিবহন করা। বিনিময়ে তারা দৈনিক হাজিরা হিসেবে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পায়। এই কর্মীদের মধ্যে শরিফ নাজমুলসহ আরও অনেকের নাম উঠে এসেছে।

জানা যায়, শরিফুল ইসলাম ৫ই আগস্টের আগে চট্টগ্রাম শহরের একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন। পরে তিনি এলাকায় ফিরে এসে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

এই বিষয়ে নেজাম ও জসিম মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সুস্পষ্ট মন্তব্য দেননি। তবে নেজাম দাবি করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মীদের ধরে রাখার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নেয় না এবং তিনি বর্তমানে মাদকের সঙ্গে জড়িত নন।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি সরাসরি যুক্ত না থাকলেও তার ফুফাতো ভাই বাংলাবাজারের সবুজ, বাবলু, ইকবাল এবং আমজাদ হোসেন সুমনের মাধ্যমে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন।

স্থানীয়দের কাছে জানতে চাওয়া হলে, তারা মনে করেন—নির্বাচন সামনে রেখে সাময়িকভাবে দূরে থাকার এই কৌশল মূলত একটি ‘নাটক’। তাদের ধারণা, ক্ষমতায় গেলে আবারও একই প্রভাব ব্যবহার করে তিনি মাদক ব্যবসায় সক্রিয় হয়ে উঠবেন।

এছাড়া স্থানীয়রা আরও জানান, “বাগানবাজার গ্রাফ”-এর ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণে জসিম মেম্বার কিছুটা নীরব অবস্থানে গেছেন। তবে তিনি নেজাম, সুমন ও মনিরকে সেল্টার দিয়ে যাচ্ছেন । অর্থাৎ জসিম মেম্বার সরাসরি নেজামকে সেল্টার দেয়।

সবশেষে একটি উদ্বেগজনক ঘটনার কথাও জানা যায়। গত ঈদুল ফিতরের একদিন পর স্থানীয় মাদককারবারীরা বিজিবির অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। পরে পুলিশের অভিযান এবং স্থানীয় বিএনপির সিনিয়র নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপে সেই অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।


Ad Banner (300x250)
Ad Banner (300x250)
Ad Banner (300x600)