ঘটনাটি ২০১৬ সালের ইউনিয়ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
আজ এত বছর পরও বাগানবাজারের অনেক মানুষ সেই ঘটনার কথা মনে করলে শিউরে উঠে। কারণ এটি শুধু একজন করিমের মৃত্যুর ঘটনা ছিলো না, এটি ছিলো বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্মম বিশ্বাসঘাতকতার একটি ভয়ংকর উদাহরণ।
করিম, আব্দুল হালিম সবুজ প্রকাশ গুপ্ত সবুজ, রুবেল, রাসেল। এরা চার বন্ধু। তাদের আড্ডার স্থান ছিলো গার্ডের দোকান। সেখানে আব্দুল হালিম সবুজ প্রকাশ গুপ্ত সবুজ, রুবেল, রাসেল নিয়মিত নেশা করতো।
বন্ধুত্ব মানে একই আড্ডা, একই হাসি, একই সময় কাটানো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—সব বন্ধু বন্ধু থাকে না। কিছু বন্ধু সময়ের প্রয়োজনে পাশে থাকে, আবার কিছু বন্ধু স্বার্থের জন্য একজন মানুষকে মৃত্যুর দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
করিম পেশায় একজন প্রাইভেটকার ড্রাইভার ও সে ভালো প্রচারণামূলক মাইকিং করতে পারতো। নির্বাচনের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে তৎকালিন ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ড এর বিএনপি মনোনীত মহিলা মেম্বার প্রার্থী নাসিমার নির্বাচনী প্রচারণার মাকিং এর জন্য করিমকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এটাই ছিলো তার পেশা, তার উপার্জনের পথ। রাজনীতি তার জন্য আদর্শের বিষয় ছিলো না, জীবিকার বিষয় ছিলো। একজন খেটে খাওয়া মানুষ হিসেবে সে কাজ নিয়েছিলো, কারণ তাকে সংসার চালাতে হতো।
একই ওয়ার্ড এর আওয়ামীলীগ থেকে মহিলা মেম্বার প্রার্থী হয় আলো রানী। যার সাথে গুপ্ত সবুজ এর অবৈধ সর্ম্পক ছিলো। স্থনাীরা বলেন, আলো রানী-কে গুপ্ত সবুজ আর্থিকভাবে সহযোগীতা করতো, বিনিময়ে আলো রানী তার শারিরীক চাহিদা মেঠাতো।
এখান থেকেই মূল দ্বন্দ্বের শুরু। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আধিপত্যের বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়ায়। একজন বন্ধুর জীবিকা তখন আর বন্ধুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সম্পর্কের আধিপত্য।
ঘটনার সূত্রপাত হয় নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে। যেখানে গুপ্ত সবুজ-র রক্ষীতা আলো রানী নির্বাচনী প্রার্থী সেখানে করিম নাসিমা মেম্বারের হয়ে নির্বাচনের প্রচারণা করাকে গুপ্ত সবুজ ও রুবেল তা মেনে নিতে পারে নি।
এখানেই প্রশ্ন উঠে—একজন মানুষ তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করলে সেটি কীভাবে বন্ধুত্বের বিরুদ্ধে চলে যায়? একজন বন্ধুকে বোঝানোর পরিবর্তে কেনো তার উপর আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করা হলো?
করিমকে নিষেদ করা হয় নাসিমা-র নির্বাচনী প্রচারণা করার জন্য। করিম উত্তরে বলেন, আমাকে যদি আলো রানী নিয়োগ দিতো তাহলে আমি তারই প্রচারণা করতাম, কারণ এটি আমার পেশা। যেহেতু সে আমাকে নিয়োগ দেয় নি তাই আমি নাসিমার প্রচারণা করছি। কারণ এটি দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ হয়।
এই কথাগুলো ছিলো একজন অসহায় শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতার কথা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার বন্ধুরা সেই বাস্তবতা বুঝতে চায়নি।
তর্ক-বিতর্ক একপর্যায়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। করিমকে বলা হয়, সে বন্ধুত্বের চেয়ে রাজনীতিকে বড় করে দেখছে এবং নিজের স্বার্থের জন্য বন্ধুদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই অপবাদ করিম মেনে নিতে পারেনি। ক্ষোভ ও অভিমানে সে জবাব দেয়—“আমি বন্ধুদের জন্য জীবন দিতেও রাজি আছি।”
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তখন সবুজ ও রুবেল তাকে সেই কথারই প্রমাণ দিতে বলে।
ঘটনাটি শুরু হয়েছিলো করিম একটি মোটরসাইকেলের জন্য ডিজেল কিনে গন্তব্যের দিকে যাওয়ার সময়। পথেই তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তাদের একজন করিমকে বলে—“তাহলে গায়ে ডিজেল ঢেলে দেখাও।” উত্তেজিত অবস্থায় করিম নিজের গায়ে কিছু ডিজেল ঢেলে দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি সেখানেই থেমে থাকেনি। অভিযোগ রয়েছে, তখন তাদের মধ্য থেকে একজন করিমের হাত থেকে বোতলটি কেড়ে নিয়ে বাকি ডিজেল তার মাথার উপর ঢেলে দেয়, যা তাকে আরও অপমানিত ও মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
অভিমান, অপমান ও ক্ষোভের সেই ভয়ংকর মুহূর্তে করিম আবারও বলে—“আমি বন্ধুদের জন্য জীবন দিতেও রাজি আছি।” আর ঠিক এরপরই সে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এই মুহূর্তটি ছিলো আবেগ, ক্ষোভ ও অভিমানের ভয়ংকর বিস্ফোরণ। করিম হয়তো মরতে চায়নি। সে হয়তো বিশ্বাস করেছিলো—তার বন্ধুরা আগের মতোই তাকে থামাবে, তাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, “পাগলামি করিস না।” কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, সেই বন্ধুত্ব তখন অনেক আগেই মৃত হয়ে গেছে।
করিম মনে করেছিলো, গুপ্ত সবুজ ও রুবেল তাকে এর আগেই নিয়ন্ত্রণ করে নিবে। কারণ সে জানতো সে অন্যায় করে নি। বন্ধুরা তাকে একটি নারীর কারণে ভুল বুঝছে। তার জন্য রাগ দেখিয়ে বন্ধুদের ভুল ভাঙ্গাতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে যেটা ভেবেছিলো প্রকৃত পক্ষে তার বন্ধুরা সে রকম নয়।
এই জায়গাটিই পুরো ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিক। একজন মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার বন্ধুদের উপর বিশ্বাস রেখেছিলো। কিন্তু সেই বিশ্বাসই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যখন তার গায়ে আগুন জ্বলে উঠে তখন সে তাদের বলে আমাকে বাঁচা। কিন্তু তার বন্ধুরা দাড়িয়ে থেকে দেখছিলো। কোনো সহযোগীতার হাত বাড়ানি। তখন গুপ্ত সবুজ ও রুবেল বলে- তুই মরে যা।
এই কয়েকটি বাক্য শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো নির্মম। একজন মানুষ আগুনে পুড়ছে, মৃত্যুর যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, আর তার বন্ধুরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছে—এই দৃশ্য কোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
তখন সে কোনো গতি না পেয়ে বাগানবাজার যাত্রী-ছাউনীর পাশে মসজিদের পুকুরে ঝাঁপ দেয়। তখন সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে পাশের উপজেলা রামগড় স্বাস্থ কমপ্লেক্স এ নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তার অবস্থা আরো খারাপ এর দিকে যেতে থাকে।
সেই সময় যারা তাকে দেখেছিলো, তারা আজও বলে—একজন মানুষের শরীর এভাবে আগুনে ঝলসে যাওয়ার দৃশ্য সহজে ভুলার মতো নয়।
তখনও গুপ্ত সবুজ ও রুবেল তার পাশে ছিলো না। বরং ২-৩ ঘন্টা অতিক্রম করার পরেও তার নিকট আত্মীয় বা পরিবারকে বিষয়টি তারা জানায় নি। যখন তার অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে থাকে অর্থাৎ তার পুরু শরীর থেকে মাংস ঝড়ে পড়তে থাকে ও চিকিৎসারত ডাক্তাররা তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চট্টগ্রাম মেডিকেল এ নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। তখন বিষয়টি তার পরিবারকে ও স্থানীয়দের জানানো হয়।
এখানেই শেষ হয়নি নির্মমতা। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পরিবারের কাছেও খবর গোপন রাখা হয়েছিলো। এটি শুধু অমানবিকতা নয়, এটি দায়িত্বহীনতা ও বিবেকহীনতার চরম উদাহরণ।
পরবর্তীতে তার তিনদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
করিম মারা গিয়েছিলো আগুনে পুড়ে। কিন্তু বাস্তবে তাকে পুড়িয়ে মেরেছিলো বিশ্বাসঘাতকতা, অমানবিকতা ও বন্ধুত্বের নামে লুকিয়ে থাকা স্বার্থপরতা।
আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে— যদি সেদিন তার বন্ধুরা তাকে থামাতো? যদি আগুন লাগার পর একজনও এগিয়ে আসতো? যদি তাকে “তুই মরে যা” না বলে বাঁচানোর চেষ্টা করতো? তাহলে হয়তো আজ করিম বেঁচে থাকতো।
কিছু মৃত্যু শুধু মৃত্যু নয়, সমাজের জন্য শিক্ষা। আর করিমের মৃত্যু আমাদের শিখিয়ে গেছে— সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু অনেক সময় দূরের কেউ নয়, সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোই।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছে সেটি শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী কোনো সাধারণ ঘটনা ছিলো না; এর পেছনে আরও গভীর কোনো প্রভাব বা নেপথ্য ইঙ্গিত কাজ করেছে। কারণ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিলো নির্বাচনকালীন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যের বিষয়গুলোও জড়িয়ে ছিলো বলে স্থানীয়দের ধারণা।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে আরেকটি বিষয়—করিমের মৃত্যুর পর তার পরিবার থেকে কোনো ধরনের মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের একাংশ এটিকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না। তাদের মতে, এমন একটি মর্মান্তিক ও আলোচিত ঘটনার পরও কোনো মামলা না হওয়া রহস্য ও সন্দেহকে আরও গভীর করেছে।
আজও বাগানবাজারের অনেক মানুষ মনে করেন, করিমের মৃত্যু শুধু একটি আত্মাহুতির ঘটনা নয়; বরং এটি এমন এক ট্র্যাজেডি, যার আড়ালে হয়তো চাপা পড়ে আছে প্রভাব, ভয়, নীরবতা এবং অজানা অনেক প্রশ্ন।