দীর্ঘ ১ বছর ৯ মাস ২৮ দিন ধরে অনুপস্থিত থাকার পর অবশেষে ১নং বাগানবাজার ইউনিয়নের জনগণ আবারও পূর্বের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সকল নাগরিক সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইউনিয়নবাসী জন্মনিবন্ধন, প্রত্যয়নপত্র, ভাতা সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
কিন্তু কেন দীর্ঘ ১ বছর ৯ মাস ২৮ দিন তিনি অনুপস্থিত ছিলেন— সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থির সময়ের দিকে। জানা যায়, স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর সারা দেশে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আত্মগোপনে চলে গেলে অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কার্যত প্রশাসনশূন্য হয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে সরকার এক প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) সাময়িকভাবে পালন করবেন।
ঠিক সেই সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জসীম মেম্বার ও কাসেম মেম্বার পূর্বের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সাজুর বাড়িতে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পুনরায় গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানান। জানা যায়, তারা চেয়ারম্যানকে আশ্বস্ত করেন যে, তাদের দলের পক্ষ থেকে কিংবা কর্মীদের মাধ্যমে কোনো ধরনের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক বাধা সৃষ্টি করা হবে না। তারা চেয়ারম্যানকে নির্ভয়ে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার আহ্বান জানান।
কিন্তু চেয়ারম্যানের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ও সাজু চেয়ারম্যান যৌথভাবে মহিউদ্দিনের সাথে পুনরায় আলোচনা করেন। মহিউদ্দিনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয় কোনো প্রকার ঝামেলা হবে না। তারপর সাজু চেয়ারম্যানের একনিষ্ঠ কর্মীকে জানানো হয় আঁধার মানিক রাস্তার মাথার কলোনিপাড়ায় কিছু কর্মীবাহিনী জড়ো করে রাখার জন্য। পরিস্থিতি যদি প্রতিকূল হয়ে যায়, যেন তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
পরদিন চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সাজু ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কিছু সময় পর সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাসেম মেম্বার, জসীম মেম্বার, মহিউদ্দিনের সমর্থক কয়েকজন কর্মী, ৮নং ওয়ার্ডের আজম ও বশিরসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি চেয়ারম্যানের ওপর হামলা চালান।
এ সময় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে মহিউদ্দিন ফোনে সাজু চেয়ারম্যানের একনিষ্ঠ কর্মীকে জানান যে, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং চেয়ারম্যানকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে চেয়ারম্যানকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ইং, তিনি পুনরায় নিজ বাড়িতে অবস্থান নিতে শুরু করেন এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, যেখানে তাঁর দলের অনেক কর্মী এখনো এলাকা ছাড়া এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অনেকেই প্রকাশ্যে এলাকায় আসতে পারছেন না, সেখানে শাহাদাত হোসেন সাজুর প্রকাশ্য ও স্বাভাবিক চলাফেরা, একই সাথে যারা তাকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল তাদের সামনেই পুনরায় ইউনিয়ন পরিষদে বহাল হওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের এখনও প্রায় তিন থেকে ছয় মাস বাকি।
জানা যায়, তৎকালীন ফটিকছড়ি-২ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর মাধ্যমে ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট পাশ হয়ে রয়েছে। যা একমাত্র সাজু চেয়ারম্যান চাইলে এই সময়ের মধ্যে গ্রহণ করতে পারেন।
বাজেটগুলোর মধ্যে রয়েছে:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ও বিএনপির কিছু কর্মীর কাছ থেকে জানা যায়, জাতীয় নির্বাচনের ৩ দিন আগে শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যান নির্বাচিত সংসদ সদস্য সারোয়ার আলমগীরের সাথে চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড় রোডে প্রায় ২ ঘণ্টার একান্ত গোপন বৈঠক করেন। তারপরের দিন, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং, তিনি পুনরায় নিজ বাড়িতে অবস্থান নেন এবং তার পরিবারের সকল সদস্য ধানের শীষেও ভোট দেন। এই সময়ে তিনি নিয়মিত বাড়িতে অবস্থান না করলেও প্রতি মাসে বাড়িতে আসেন এবং ইউনিয়ন বিএনপির নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করেন। যদি এই পর্যন্ত তিনি তার কোনো কর্মী বা আওয়ামীলীগ নেতাদের কোনো খোঁজ-খবর নেয় নি ও দলীয় কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে নি।
জানা যায়, বর্তমানে শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যানের সকল বৈধ ও অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন মহিউদ্দিন। মহিউদ্দিনের সকল সরকারি ইজারায় যেমন: বাগানবাজার ইউনিয়নের সকল গরুর হাট, বালুর ঘাটসহ আরও বেশ কয়েকটি ইজারায় রয়েছে শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যানের ৫০% শেয়ার। একই সাথে জানা যায়, শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যান দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে সকল টিসিবির পণ্যের ৫০% মহিউদ্দিন পেতেন। তখন শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যানের বিএনপির পক্ষ থেকে অভিভাবক ছিলেন মহিউদ্দিন।
এছাড়া জানা যায়, সম্প্রতি ঈদুল আজহা উপলক্ষে শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যানের বাড়িতে মহিউদ্দিন দাওয়াত পান এবং সেখানে উপস্থিত হয়ে ৫ কোটি টাকার বাজেটের ৫০% কমিশনের চুক্তিতে শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যানকে ইউনিয়ন পরিষদে পুনর্বহাল করার জন্য সারোয়ার আলমগীরের নিকট সুপারিশ করেন এবং ডিসি অফিস থেকে একটি অপ্রকাশিত যোগদানপত্রেরও সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা যায়। যাহা হাইকোর্ড বিভাগের রিট পিটিশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, চেয়ারম্যানের সাথে ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সমঝোতা হয়েছে যে তিনি শুধু ইউনিয়ন পরিষদে বসবেন এবং স্বাক্ষর করবেন। শালিস-বিচারের ক্ষেত্রে তিনি শুধু তারিখ দিবেন, তবে বিচার করবেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা, যেমন জসীম মেম্বার, আবু মেম্বার ও মহিউদ্দিন। তবে সিংহভাগ সিদ্ধান্ত নিবেন মহিউদ্দিন।
এছাড়াও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে যতগুলো বাজেট পূর্বে থেকে পাশ হয়ে রয়েছে, তা দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুমোদন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে মহিউদ্দিনকে এককভাবে ৫০% ভাগ দেওয়া হবে বলেও জানা যায়। অন্যান্য নেতাদের এই বলে রাজি করানো হয়েছে যে সকলের মাঝে সমানভাবে কমিশন বণ্টন করা হবে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের দাবি, শাহাদাত হোসেন সাজু চেয়ারম্যান মহিউদ্দিনের শেল্টারে ইউনিয়ন পরিষদে পুনর্বহাল হয়েছে কারণ বাগানবাজার ইউনিয়নে বর্তমান সংসদ সদস্যের বিশ্বস্ত কর্মী হচ্ছেন মহিউদ্দিন। সে সুবাদে সারোয়ার আলমগীরকে মহিউদ্দিন রাজি করিয়ে শাহাদাত হোসেন সাজুকে ইউনিয়ন পরিষদে পুনর্বহাল করেছেন।