চাঁদা না দেওয়ায় মারধর, অস্ত্রের ভয়, গুলি, দোকান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ; দুই লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার কথাও অভিযোগপত্রে
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চুড়ামনি এলাকায় এক নারী দোকানির কাছে এককালীন বার্ষিক ১০ হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবির অভিযোগে একরামুল হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-০১-এ ফৌজদারি অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মনোয়ারা বেগম (৪৫) দাঁতমারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চুড়ামনি গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামীর নাম দুদু মিয়া। আদালতে দেওয়া অভিযোগে একরামুল হককে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন আবুল হোসেন প্রকাশ চন্দনার জামাই, মো. শরীফ, রাসেল, মহিন উদ্দিন, ইয়াকুব চৌধুরী, আবদুস শুক্কুর, আবদুল করিম, জামাল উদ্দিন, জাহান ও রুবেল। অভিযোগপত্রে তাদের সবাইকে দাঁতমারা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩০৭, ৩৪১, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৮৭, ৩৯৫, ৩৯৭, ৩৯৮, ৪২৭, ৫০৬(২) ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। নথিতে প্রথম ঘটনার সময় ৩ জানুয়ারি ২০২৫ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা এবং দ্বিতীয় ঘটনার সময় ২ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ২টা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যবর্তী সময়ে ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যাতেও আরেক দফা ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
মনোয়ারা বেগমের অভিযোগ, গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে চার-পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে আসামিরা তার চা ও মুদি দোকানে আসেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়ার পর আবুল হোসেন ও আবদুল করিম ক্যাশবক্স থেকে ৫০০ টাকার দুটি নোট নিয়ে নেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
বাদিনী বিলের টাকা চাইলে ১ নম্বর আসামি একরামুল হকের নেতৃত্বে তাকে বলা হয়, এলাকায় ব্যবসা করতে হলে স্থানীয় ‘ভাই-ব্রাদারদের’ টাকা দিতে হবে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, তার কাছে এককালীন বার্ষিক ১০ হাজার টাকা এবং প্রতি মাসের ১ তারিখের মধ্যে ২ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ওই দিন বিল পরিশোধ না করেই তারা চলে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
মনোয়ারা বিষয়টি পরে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানান। তারা অভিযুক্তরা আবার এলে খবর দিতে বলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে অভিযুক্তরা আবার দোকানে এসে আগের দাবি করা টাকা চান। তখন মনোয়ারা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ফোন করার চেষ্টা করলে জামাল উদ্দিন তার চুলের মুঠি ধরে চড়-থাপ্পড় দেন এবং রুবেল তার হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় ইয়াকুব চৌধুরী একটি পিস্তল দেখিয়ে তাকে গুলি করার হুমকি দেন বলেও নালিশে বলা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, মহিন উদ্দিন ফোনে একরামুল হককে টাকা আদায় করতে না পারার কথা জানান। লাউডস্পিকারে সেই কথোপকথন শুনেছেন দাবি করে মনোয়ারা অভিযোগপত্রে বলেন, একরামুল হক তখন তাদের ‘অপারেশন চালাতে’ নির্দেশ দেন।
অভিযোগপত্রের পরবর্তী বর্ণনায় বলা হয়, ২ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ২টার দিকে কয়েকটি মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে মনোয়ারা ঘর থেকে বের হন। সৌরবিদ্যুতের আলোতে তিনি অভিযুক্তদের দোকানের তালা ভাঙার চেষ্টা করতে দেখেন বলে দাবি করেন।
তিনি কাছে গেলে একরামুল হক বন্দুক দেখিয়ে এগোলে গুলি করার হুমকি দেন বলে অভিযোগ। একই সময় ইয়াকুব চৌধুরী কোমর থেকে পিস্তল বের করে প্রথমে ওপরের দিকে এবং পরে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন বলে মনোয়ারার অভিযোগ। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, একটি গুলি তার কানের পাশ দিয়ে চলে যায়।
এরপর দোকানের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে মনোয়ারা বলেন, তার ছেলে মনির হোসেন কিডনি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ছেলের অপারেশনের জন্য মেডিকেলে জমা দেওয়া টাকা রোগী মারা যাওয়ায় অপারেশন না হওয়ায় ফেরত পাওয়া যায়।
তার দাবি, অভিযুক্তরা বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন। একরামুল হক তার গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে মেডিকেল থেকে ফেরত পাওয়া ২ লাখ টাকা দিতে বলেন। পরে দোকানের পাশের বাড়ির আলমারিতে রাখা ওই ২ লাখ টাকা জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মনোয়ারা বেগমের দাবি, হট্টগোল ও গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এবং সাক্ষীরা আলো নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা সঙ্গে থাকা গান পাউডার ছিটিয়ে দোকানে আগুন ধরিয়ে দেন।
সাক্ষীরা কাছে পৌঁছালে ঘটনার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করলে বাদিনী ও সাক্ষীদের হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর গুলি করতে করতে অভিযুক্তরা মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে নালিশে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার পর মনোয়ারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে জানান বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পুড়ে যাওয়া দোকান পরিদর্শন করে এবং পরদিন সকালে থানায় যোগাযোগ করতে বলে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সকালে তিনি থানায় গিয়ে ঘটনা ও অভিযুক্তদের নাম-ঠিকানা জানান। পুলিশ প্রথমে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার কথা জানায়। পরে বিকেলে আবার থানায় গেলে তাকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে নালিশে উল্লেখ রয়েছে। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শের কারণে আদালতে অভিযোগ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
পরে ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে তিনি আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আমলে নেওয়া, আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং বিচারের মাধ্যমে শাস্তির আবেদন করেন।
এখনো কোনো মতামত নেই। প্রথম মতামত দিন!