চট্টগ্রামের নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠনের পর এবার সদর দপ্তর নির্ধারণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি নথি, গণশুনানির সুপারিশ এবং প্রশাসনিক মানচিত্র পর্যালোচনায় একাধিক অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গণশুনানিতে উঠে আসা সুপারিশ উপেক্ষা করে পরবর্তীতে সদর দপ্তরের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, গণশুনানি ছাড়াই হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়নকে নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ জানিয়েছে, বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।
গণশুনানি থেকে আন্দোলন
গত ১ জুলাই ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা ঘোষণার পর থেকেই সদর দপ্তর কোথায় হবে—এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলে আন্দোলন শুরু হয়। বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাটসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, হরতাল, কালো পতাকা কর্মসূচি, মানববন্ধন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, নতুন উপজেলা গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বৈষম্য দূর করা এবং দূরবর্তী জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সদর দপ্তরের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিনের দাবির পেছনের কারণ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট ও ভুজপুর ইউনিয়নের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কারণ, বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা সদর থেকে এসব এলাকার দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক সেবা নিতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর চার ইউনিয়নে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নতুন উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়নে কোনো গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
সদর দপ্তর নিয়ে কী অভিযোগ?
অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি প্রশাসনিক প্রস্তাবে নতুন উপজেলার সদর দপ্তর জুজখোলা মৌজায় স্থাপনের বিষয় উঠে আসে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে ব্যবহৃত নথি ও মানচিত্রে সদর দপ্তরের অবস্থান পরিবর্তন করে পশ্চিম ভুজপুর এলাকায় দেখানো হয়।
স্থানীয়দের দাবি, গণশুনানির সুপারিশ ও প্রাথমিক প্রশাসনিক নথির সঙ্গে পরবর্তী সিদ্ধান্তের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সদর দপ্তর নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দূরত্বের হিসাবেই বৈষম্যের প্রশ্ন
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা সদর থেকে হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিলের দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। বিপরীতে বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাটের মানুষকে প্রশাসনিক কাজে প্রায় ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়।
তাদের মতে, নতুন উপজেলা গঠনের মূল লক্ষ্য যদি দূরবর্তী জনগণের ভোগান্তি কমানো হয়, তাহলে সদর দপ্তরের অবস্থান এমন হতে হবে, যা অধিকাংশ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও ভৌগোলিকভাবে যৌক্তিক।
দুটি মানচিত্র, দুটি চিত্র
প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনায় দুটি পৃথক মানচিত্র সামনে এসেছে।
একটিতে নতুন উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র জুজখোলা মৌজার দিকে নির্দেশ করা হয়েছে। অন্যটিতে সদর দপ্তরের অবস্থান দেখানো হয়েছে পশ্চিম ভুজপুরে।
এই দুই মানচিত্রের পার্থক্য নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তী পর্যায়ে ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তনের মাধ্যমে গণশুনানির সুপারিশ থেকে সরে আসা হয়েছে।
নথি ও বাস্তবতার মধ্যে অসামঞ্জস্য?
সংশ্লিষ্ট নথি, মাঠ প্রশাসনের প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সদর দপ্তরের অবস্থান, নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়নের তালিকা, ভৌগোলিক বিন্যাস এবং যোগাযোগের যৌক্তিকতা—এসব বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নথিতে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ জানিয়েছে, বিষয়টি পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের আন্দোলনকারীরা বলছেন, গণশুনানির সুপারিশ, প্রশাসনিক যুক্তি এবং জনস্বার্থকে ভিত্তি করে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এখনো কোনো মতামত নেই। প্রথম মতামত দিন!