শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
রাজনীতি ৫ জুন ২০২৬

ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা, বাজেট আর টাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে সাজানো হয়েছিল এক নিখুঁত “চেয়ারম্যান ষড়যন্ত্র”

বাগানবাজার গ্রাফ নিউজ ডেস্ক

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যখন সারাদেশে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর ক্ষমতার পালাবদলের ঝড় বইছিল, তখন বাগানবাজার ইউনিয়নেও নিঃশব্দে তৈরি হচ্ছিল এক ভয়ংকর খেলা। বাইরে ছিলো অস্থিরতা, আর ভেতরে চলছিল ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ।

স্বৈরাচার পতনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠরা যখন আত্মগোপনে, তখন বাগানবাজারের সাজু চেয়ারম্যান ছিলেন নিজ বাড়িতেই। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো পরিস্থিতি সামলে আবারও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই সময়ই নেপথ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠেন দুই ইউপি সদস্য— জসিম মেম্বার ও কাসেম মেম্বার।

স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, তাদের মাথায় তখন একটাই হিসাব— যদি কোনোভাবে সাজু চেয়ারম্যানকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সরানো যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ মিলতে পারে। আর সেই সুযোগ মানেই ক্ষমতা, প্রভাব এবং ইউনিয়ন পরিষদের নিয়ন্ত্রণ।

তবে বাগানবাজার বিএনপির অধিকাংশ সিনিয়র নেতার অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা চাইছিলেন সাজু চেয়ারম্যান দায়িত্বে থেকেই জনগণের সেবা চালিয়ে যান। কিন্তু জসিম ও কাসেমের পরিকল্পনা চলছিল নীরবে, আড়ালে।

ঘটনার সূত্রপাত ইউনিয়ন পরিষদে যাওয়ার আগের রাতে। জানা যায়, সাজু চেয়ারম্যানের বাড়িতে বসে জসিম মেম্বার ও কাসেম মেম্বারের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক। সেখানে তারা সাজুকে আশ্বস্ত করেন— “নির্ভয়ে ইউনিয়ন পরিষদে যান, কোনো সমস্যা হবে না।” একই সময়ে সাজু ফোনে যোগাযোগ করেন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে। তারাও তাকে আশ্বাস দেন।

পরদিন সকাল। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর সাজু চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদে যান কার্যক্রম শুরু করতে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

অভিযোগ উঠেছে, জসিম ও কাসেম মেম্বারের অনুসারীরা হঠাৎ করেই পরিষদে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সাজু চেয়ারম্যান বাধ্য হন ইউনিয়ন পরিষদ ছেড়ে চলে যেতে।

এরপরই বাগানবাজারজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা, গুঞ্জন, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ।

বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, পুরো ঘটনার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদ দখল করা। জসিম ও কাসেম মেম্বার ভেবেছিলেন, সাজুকে সরাতে পারলেই তাদের মধ্য থেকেই কেউ একজন ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ পাবেন।

কিন্তু নাটকের মোড় ঘুরে যায় হঠাৎই।

দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়ে দেয়— প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা। আর এই ঘোষণার পরই নাকি মাথায় হাত পড়ে যায় পরিকল্পনাকারীদের।

স্থানীয়দের ভাষ্য, তারা ধারণা করেছিলেন সাজু চেয়ারম্যানের সময় পাস হওয়া বিভিন্ন বাজেট ও প্রকল্পের সুবিধা নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এককভাবে ভোগ করতে পারবেন। কিন্তু সেই হিসাব পুরোপুরি ভেস্তে যায়।

এরপর থেকেই নাকি শুরু হয় অনুশোচনা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাজুকে সরানোর পর ইউনিয়নজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক লুটপাট। বিভিন্ন অনুদান, প্রকল্প ও বরাদ্দ ঘিরে কাসেম মেম্বার, জসিম মেম্বার, আবু মেম্বার ও মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে।

পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে যখন সাজু চেয়ারম্যান হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের পর থেকেই তিনি আবার স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেন। আর তখনই বদলে যেতে থাকে সমীকরণ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, কাসেম, জসিম ও মহিউদ্দিন একাধিকবার গোপনে সাজু চেয়ারম্যানের বাড়িতে বৈঠক করেন। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আবু মেম্বারও। এই যোগাযোগের পেছনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন শফি উল্লাহ নামের এক বিএনপি কর্মী, যিনি সাজু চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত।

এদিকে, যাদের একসময় সাজুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষুব্ধ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তারাও ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যান।

৮ নম্বর ওয়ার্ডের আজম, যাকে সাজুর কড়া বিরোধী হিসেবে পরিচিত করা হতো, সাজুর পুনরায় ইউনিয়ন পরিষদে যোগদানের দিন ছিলেন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। স্থানীয়দের দাবি, তাকে আর্থিকভাবে “ম্যানেজ” করা হয়েছে।

একই অভিযোগ উঠেছে জাহাঙ্গীরকে নিয়েও। জানা যায়, সাজুর বিরোধিতা করতে দলবল নিয়ে এলেও পরে তাকে ২০ হাজার টাকার মাধ্যমে শান্ত করা হয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও গুঞ্জন রয়েছে— ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। কারও হাতে ১ লাখ, কারও হাতে ২ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা বিভিন্ন মহলে বণ্টন করা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয় সূত্রগুলোর।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাগানবাজারে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এটি কি শুধুই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, নাকি ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা ও অর্থ নিয়ন্ত্রণের জন্য সাজানো হয়েছিল পুরো নাটক? সময়ই হয়তো তার উত্তর দেবে।


Ad Banner (300x250)
Ad Banner (300x250)
Ad Banner (300x600)