অভিযুক্ত তাজউদ্দিন; প্রথমে কয়েকটি থাপ্পড়-লাথিতে ‘বিচার’ শেষ করার অভিযোগ, পরে অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা ও প্রতিবাদকারীদের মামলা দিয়ে ভয় দেখানোর দাবি
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার বাগানবাজার ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড মাস্টারপাড়া এলাকায় ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ তাজউদ্দিন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গত ১৫ অক্টোবর ঘটনাটি ঘটে বলে ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় একাধিক সূত্র বাগানবাজার গ্রাফকে জানিয়েছে।
অভিযুক্ত তাজউদ্দিনের বয়স আনুমানিক ৫০ থেকে ৫৫ বছর। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হাকিমের ছেলে। ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে বাগানবাজার গ্রাফ তার নাম প্রকাশ করছে না।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজউদ্দিন নিয়মিত গাঁজা সেবন করতেন এবং এর আগেও ওই বৃদ্ধার সঙ্গে অশালীন কথাবার্তা ও আচরণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার দিন বৃদ্ধার বাড়িতে থাকা ছাগলগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাগল সামলাতে বৃদ্ধা ঘর থেকে বের হলে তাজউদ্দিন তাকে কৌশলে একটি ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার সময় বৃদ্ধা দীর্ঘ সময় ধরে চিৎকার করছিলেন। কিন্তু বাড়িগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেশি হওয়ায় আশপাশের লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে তার চিৎকার শুনতে পারেননি। পরে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাটি জানতে পারেন।
ঘটনার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য এবং মাস্টারপাড়া সমাজের সভাপতি সোলেমান মেম্বারকে অবহিত করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্ষণের মতো গুরুতর একটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানোর পরিবর্তে বিষয়টি প্রথমে ঘরোয়াভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।
সেই বিচার চলাকালে সোলেমান মেম্বার অভিযুক্ত তাজউদ্দিনকে দুটি থাপ্পড় দেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এরপর বিষয়টি সেখানেই শেষ করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একজন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধাকে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগের বিচার কয়েকটি থাপ্পড় বা লাথির মধ্যেই কেন সীমাবদ্ধ রাখা হলো?
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রথমদিকে ঘটনাটি সীমিত মানুষের মধ্যে থাকলেও পরে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেখানে নুরুল ইসলাম নুরু, কিরণ, ভুট্টো ও মামুনসহ স্থানীয় কয়েকজন ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন।
এরপর বিষয়টি আরও মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং ভুক্তভোগীর ছেলে ঘটনার যথাযথ বিচার দাবি করতে শুরু করেন।
স্থানীয়দের একটি অংশও ঘটনাটির প্রতিবাদ করেন এবং ঘরোয়া সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি শেষ না করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি ব্যাপকভাবে জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত তাজউদ্দিনের স্বজন এবং স্থানীয় সালিশের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি টাকা দিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারকে সমঝোতায় রাজি করানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু পরিবার বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা করতে রাজি হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
এরপর থেকেই পরিবার ও যারা ঘটনাটির প্রতিবাদ করছিলেন, তাদের ওপর চাপ ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ ওঠে।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাগানবাজার যুবদলের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচিত মহিউদ্দিন এবং তার অনুসারী ইলিয়াস, নূর ইসলাম, মজিবুল হক মজু ও লালু মাস্টারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ইলিয়াসের বিরুদ্ধে স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে প্রতিবাদকারীদের মামলা দিয়ে হয়রানি করার ভয় দেখানোর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যারা ঘটনাটির প্রতিবাদ করছিলেন তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা কেন বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করছেন। প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে মামলা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও হুমকির অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ছাড়া স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্ত তাজউদ্দিনের ছোট ভাই দ্বীন মোহাম্মদ ওরফে দ্বীনুর বিরুদ্ধেও পরিবার ও প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিয়ে বেশি কথা বললে বা প্রতিবাদ করলে মামলা এবং মাদক-সংক্রান্ত মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।
এ কারণে ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় প্রতিবাদকারীদের একটি অংশ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ধর্ষণের মতো একটি গুরুতর অভিযোগ কেন প্রথমে সামাজিক সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হলো।
স্থানীয়দের বক্তব্য, সামাজিক বিরোধ বা ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে সালিশ হতে পারে। কিন্তু একজন বৃদ্ধার ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগকে অর্থের বিনিময়ে বা কয়েকটি থাপ্পড়-লাথিতে শেষ করার সুযোগ নেই।
তাদের প্রশ্ন, ঘটনার পরপরই পুলিশকে জানানো হলো না কেন, অভিযুক্তকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হলো না কেন এবং পরিবার বিচার চাইতে গেলে তাদের ওপর চাপ তৈরির অভিযোগ উঠছে কেন?
ভুক্তভোগীর পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্ত তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তাদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের ভূমিকাও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এখনো কোনো মতামত নেই। প্রথম মতামত দিন!