সরকারি বরাদ্দ বা জনপ্রতিনিধির উদ্যোগের অপেক্ষা না করে প্রায় দুই লাখ টাকা তুলে ৩০০ ফুট রাস্তার ব্রিক সলিং করছেন স্থানীয়রা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাগানবাজারে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মুখে উন্নয়ন নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের দীর্ঘদিনের সড়ক দুর্ভোগ কমাতে এবার নিজেদের অর্থেই রাস্তা সংস্কারে নেমেছেন বাগানবাজার ইউনিয়নের তিন সমাজের বাসিন্দারা।
নয়দোলং সমাজ, রহমতপুর কচুয়াখুন্দা সমাজ ও রহমতপুর হারবাতলী সমাজের বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে প্রায় দুই লাখ টাকা সংগ্রহ করে ৩০০ ফুট রাস্তার ব্রিক সলিংয়ের কাজ শুরু করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এলাকার উন্নয়ন নিয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও ইউনিয়নের অনেক সড়ক এখনো চলাচলের উপযোগী হয়নি। বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও কার্যকর উদ্যোগ না আসায় শেষ পর্যন্ত নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মেটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিন সমাজের মানুষ।
স্থানীয়দের একটি অংশ বলছেন, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধি ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বক্তব্যে সড়ক, কালভার্ট, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা গুরুত্ব পায়। কিন্তু বাস্তবে এমন মৌলিক একটি রাস্তার সংস্কারের জন্য যদি সাধারণ মানুষকেই নিজেদের পকেট থেকে দুই লাখ টাকা তুলতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এতদিন এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই রাস্তা কোথায় ছিল?
তাদের প্রশ্ন, উন্নয়ন যদি সরকারি বাজেট ও জনপ্রতিনিধিদের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি হয়, তাহলে একটি প্রয়োজনীয় রাস্তা চলাচলের উপযোগী করতে তিনটি সমাজকে কেন নিজেরাই অর্থ সংগ্রহ করতে হলো?
স্থানীয়দের মতে, বিষয়টি শুধু একটি রাস্তার নয়। এটি স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি বরাদ্দের অগ্রাধিকার এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনছে।
তিন সমাজের সম্মিলিত অর্থায়নে প্রায় ৩০০ ফুট সড়কে ব্রিক সলিং করা হচ্ছে। কাজটির জন্য আনুমানিক দুই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, এই সড়কটি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণির বাসিন্দাদের নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করতে হয়।
বর্ষাকাল কিংবা খারাপ আবহাওয়ায় চলাচলের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি থাকলেও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ না পাওয়ায় বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে অর্থ সংগ্রহ করেন।
এলাকাবাসী তিন সমাজের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, সামাজিক ঐক্য ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে, যে উন্নয়ন সরকারি বরাদ্দ ও স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে হওয়ার কথা, সেই উন্নয়নের ব্যয় বারবার সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হলে সরকারি উন্নয়ন বাজেটের সুফল কোথায় যাচ্ছে?
স্থানীয়রা বলছেন, মানুষ নিজেরা টাকা তুলে একটি ছোট অংশের রাস্তা সংস্কার করতে পারে। কিন্তু ইউনিয়নের পুরো সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা এভাবে মানুষের ব্যক্তিগত অর্থে নির্মাণ বা সংস্কার করা সম্ভব নয়।
তাই সামাজিক উদ্যোগকে সরকারি দায়িত্বের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের উন্নয়নকেন্দ্রিক বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই তিন সমাজের এই উদ্যোগ নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু “উন্নয়ন করব” বললেই যথেষ্ট নয়। কোন রাস্তা কতদিন ধরে অবহেলিত, কোথায় সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন, কীভাবে প্রকল্প নেওয়া হবে এবং নির্বাচিত হলে কত সময়ের মধ্যে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর নির্বাচনের পরে মানুষকে নিজের টাকায় রাস্তা বানানোর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান থাকলে সেই প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
তিন সমাজের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এলাকার প্রয়োজন বিবেচনায় তারা নিজেরাই অর্থ সংগ্রহ করে কাজটি শুরু করেছেন। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে সম্মিলিতভাবে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তাদের।
তবে তারা চান, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও জনপ্রতিনিধিরা যেন এটিকে মানুষের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে না দেখেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তিন সমাজের উদ্যোগে শুরু হওয়া কাজের পাশাপাশি এলাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কও সরকারি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সচেতন মহলের মতে, নিজেদের অর্থে রাস্তা সংস্কার সামাজিক ঐক্যের একটি ইতিবাচক উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি একটি কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরে, যে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা সহজ, মাঠে সেই উন্নয়ন পেতে অনেক সময় সাধারণ মানুষকেই নিজের পকেট খুলতে হচ্ছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। প্রথম মতামত দিন!