ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার বাগানবাজার ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গরু চুরির একটি ঘটনা নিয়ে গভীর রাতে অনুষ্ঠিত সালিশকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য মো. আবুল কাশেমের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি হাকিম আলী মার্কেট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল কালামের একটি গরু গভীর রাতে চুরি হয়। ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে আলম, সজীব ও কাউছার নামের তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। আলমের পিতার নাম লাশক্বর আলী, সজীবের পিতা জাকির কবিরাজ এবং কাউছারের পিতা রহমান বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিশ হওয়ার কথা থাকলেও তা দীর্ঘদিন হয়নি। পরে গত রাতে আন্দারমানিক বাজারে রাত ১১টার পর সীমিত কয়েকজনকে নিয়ে সালিশ অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, এলাকার প্রচলিত সামাজিক বিচার ব্যবস্থায় যাদের নিয়মিতভাবে রাখা হয়, সেই বয়োজ্যেষ্ঠ, সমাজপতি ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনেককেই ওই সালিশের বিষয়ে জানানো হয়নি। উপস্থিত ছিলেন গরুর মালিক, কাশেম মেম্বার এবং আরও কয়েকজন ব্যক্তি।
সালিশে আলমকে ৭০ হাজার টাকা এবং সজীব ও কাউছারকে মোট ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, একটি চুরির মতো গুরুতর ঘটনা নিয়ে বিচার হলে এলাকার সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেন সেখানে রাখা হলো না।
তাদের বক্তব্য, একটি সামাজিক সালিশ যদি সত্যিকার অর্থে সমাজের বিচার হয়, তাহলে সেটি রাতের গভীরে সীমিত কয়েকজনের উপস্থিতিতে কেন করতে হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া ও অর্থদণ্ডের সিদ্ধান্ত কেন জনসম্মুখে পরিষ্কার করা হবে না।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, কাশেম মেম্বার নিজ উদ্যোগে পুরো সালিশ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং বৃহত্তর সামাজিক মতামত নেওয়ার পরিবর্তে সীমিত পরিসরে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছেন।
তবে বর্তমান ঘটনাটি নিয়েই শুধু প্রশ্ন উঠছে না। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, গত প্রায় এক বছরে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে চুরি বা অন্যান্য ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হাতেনাতে ধরা পড়ার পর একাধিক সামাজিক সালিশ হয়েছে এবং বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানাও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার কয়েকটিতে জরিমানার অর্থ যে ব্যক্তি বা পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পুরো অর্থ পাননি, এমন অভিযোগ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এসব সালিশে আদায় করা জরিমানার অর্থ কোনো স্বচ্ছ সামাজিক তহবিল বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে না গিয়ে কাশেম মেম্বারের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, এমন অভিযোগও স্থানীয়দের একটি অংশ করে আসছেন।
সর্বশেষ গরু চুরির ঘটনায় প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা নির্ধারণের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, এই টাকা কে গ্রহণ করবে, গরুর মালিক কত টাকা পাবেন, কোনো অংশ সামাজিক তহবিলে যাবে কি না এবং অর্থ আদায় হলে তার লিখিত হিসাব বা রসিদ থাকবে কি না।
স্থানীয়দের বক্তব্য, সালিশে অর্থদণ্ড আরোপ করা হলে সেই অর্থের উৎস, আদায়, প্রাপক এবং ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার হিসাব থাকা প্রয়োজন। তা না হলে সামাজিক বিচার নিয়ে সন্দেহ এবং ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অভিযোগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
স্থানীয়দের কেউ কেউ আরও অভিযোগ করছেন, অভিযুক্তদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার প্রবণতা অপরাধীদেরও উৎসাহিত করতে পারে।
বর্তমান ঘটনা এবং আগের অভিযোগগুলো মিলিয়ে স্থানীয়দের মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজের দায়িত্বশীলদের বাদ দিয়ে গভীর রাতে সালিশ কেন করা হলো, এক লাখ টাকা জরিমানার ভিত্তি কী, অর্থ কার কাছে জমা হবে এবং গত এক বছরে বিভিন্ন সালিশে আদায় করা জরিমানার অর্থের কোনো লিখিত হিসাব আছে কি না।
একই সঙ্গে আগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা জরিমানার পুরো অর্থ পেয়েছেন কি না এবং সালিশের অর্থ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের যে অভিযোগ রয়েছে, সেটিরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তারা।
স্থানীয়দের বক্তব্য, সামাজিক বিচার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার জায়গা হলে সেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত থাকা জরুরি। কোনো একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে সালিশ এবং জরিমানার অর্থ থাকলে সেই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
এখনো কোনো মতামত নেই। প্রথম মতামত দিন!