বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
অপরাধ ১৪ মে ২০২৬

দিবালোকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল হেয়াকো বাজারের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা আব্দুল গনিকে, ১৬ বছরেও শেষ হয়নি বিচার।

বাগানবাজার গ্রাফ নিউজ ডেস্ক

ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হেয়াকো বাজার। সেই বাজারের দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল গনিকে দিনের আলোতে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। দীর্ঘ ১৬ বছর পার হলেও এখনো শুরু হয়নি মামলার বিচারিক কার্যক্রম।

১/১১ সরকারের পর ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এর প্রভাব পড়ে ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়নেও। ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

দাঁতমারা ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ছিল হেয়াকো বাজার। বাজার পরিচালনা কমিটির টানা দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন তৎকালীন দাঁতমারা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল গনি। স্থানীয়দের কাছে তিনি একজন সৎ ব্যবসায়ী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ১৩ মে চট্টগ্রাম শহর থেকে নিজ বাড়ি দাঁতমারা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ধর্মপুর গ্রামে আসেন আব্দুল গনি। পরিবারের দাবি, পরদিন একটি মামলার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য তৎকালীন ভূজপুর থানার ওসি তাকে থানায় উপস্থিত থাকতে বলেছিলেন।

১৪ মে ২০১১। দুপুর প্রায় ২টা।
আব্দুল গনি তার ভাগিনা শাহ সিরাজ আলম আকাশকে মুঠোফোনে কল করে মোটরসাইকেলে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বলেন। আকাশ মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়িতে আসেন। তবে আব্দুল গনি তাকে জানান, তার দুই মেয়ে সোহেদা ও শান্তাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য বাজারে নিয়ে যেতে হবে। এরপর তিনি নিজে হেঁটে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

পেছনে মোটরসাইকেলে তার মেয়েদের নিয়ে আসছিলেন ভাগিনা আকাশ।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, একই গ্রামের আনিসুল হকের বাড়ির সামনে পৌঁছালে আব্দুল গনি দেখতে পান, আনিসুল হক, আবু আহম্মেদ, আফছার, ফারুকসহ ৭ থেকে ১০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে। তাদের দেখে তিনি পেছনের দিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তার দিকে একটি বড় কাঠের টুকরা ছুড়ে মারা হয়। এতে তিনি মাটিতে পড়ে যান।

অভিযোগ রয়েছে, এরপর কয়েকজন তার দুই হাত ও দুই পা শক্তভাবে চেপে ধরে। পরে আফছার নামে একজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গলা কেটে দেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান আব্দুল গনি।

নিহতের ভাগিনা শাহ সিরাজ আলম আকাশ দাবি করেন, দৌড়ে পালানোর সময় আব্দুল গনি স্থানীয় পান ব্যবসায়ী শামসুর বাড়িতে আশ্রয় চাইতে গিয়েছিলেন। তবে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়নি। তার অভিযোগ, ওই বাড়িতেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে আব্দুল গনির দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। ধর্মপুর এলাকায় আবু আহম্মেদ টেইলারের বিরুদ্ধে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে একাধিক সালিশ করেছিলেন আব্দুল গনি। এর জের ধরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে দাবি করেন তিনি।

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে দিবালোকে এমন হত্যাকাণ্ড কয়েকজন ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। তাদের দাবি, এর পেছনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মদদ ছিল।

অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন মজিবুল হক চৌধুরী, তার ভাই ভুট্টো, দুলাল মেম্বার, পোলট্রি মনুসহ আরও কয়েকজন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল গনি তখন হেয়াকো বাজারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে বাজারের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে তার শক্ত অবস্থান ছিল। এ কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামীলীগ নেতারা পান ব্যবসায়ী শামসুর সঙ্গে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা হয়েছিল। তারা আরও দাবি করেন, মামলার চার্জশিটে ১১ নম্বর আসামি হিসেবে শামসুর নাম থাকলেও পরবর্তীতে তা বাদ দেওয়া হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট জমা দেন। তবে দীর্ঘ ১৬ বছরেও মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।

পরিবারের অভিযোগ, চার্জশিট থেকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন আসামিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নিহত আব্দুল গনির স্ত্রী মেহেরা খাতুন বলেন, “স্বামী হত্যার পর চার সন্তানকে নিয়ে নিরাপত্তার কারণে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। আমার স্বামী বিএনপির একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। কিন্তু হত্যার পর দীর্ঘ সময়েও দলের অনেকেই খোঁজ নেয়নি। আল্লাহর ওপর ভরসা করেই সন্তানদের বড় করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে দিবালোকে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। মামলার বেশিরভাগ আসামি জামিনে বের হয়ে আমাদের সম্পদ দখল করেছে।”

তার অভিযোগ, ফটিকছড়ির হেয়াকো ও পার্শ্ববর্তী পাতাছড়া এলাকায় থাকা পরিবারের কয়েকটি মূল্যবান জায়গা জবরদখল করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি উদ্ধারে বাধা দিতে গেলে তিনি ও তার সন্তানরা হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।

নিহতের ছেলে শাহীন বলেন, “আমার বাবা সবসময় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। এ কারণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে হত্যা করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। একদিকে ১৬ বছরেও বাবার হত্যার বিচার হয়নি, অন্যদিকে বাবার কষ্টার্জিত সম্পদ থেকেও আমরা বঞ্চিত।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে হুমকি-ধমকি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই দিন কাটছে আমাদের।”

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবার নতুন করে বিচার পাওয়ার আশা করলেও এখনো মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মামলার পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জহির আজম চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘদিনেও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া দুঃখজনক। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

বাদীপক্ষের আইনজীবী তরুণ কিশোর দেব বলেন, মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তবে বাদীপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে।


Ad Banner (300x250)
Ad Banner (300x250)
Ad Banner (300x600)