২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর, ঈদুল আজহার ২য় দিন—যে দিনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ, ভালোবাসা আর প্রেরণার; সেই দিনটিই বাগানবাজারের ইতিহাসে রয়ে গেছে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে।
করালিয়া দরগাহ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে এলাকার একদল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া উদ্যমী তরুণের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে একটি মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট— গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে স্বপ্নের দরজা খুলে দেওয়া, তাদের বড় কিছু ভাবতে শেখানো।
সেদিন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসার সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীরা দলে দলে উপস্থিত হয়েছিল। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ সেলিম (পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র ও বর্তমান বিসিএস ক্যাডার নাজমুল হোসাইন, বর্তমানের সুপরিচিত আইনজীবী এডভোকেট ইউসুফ আলম মাসুদ, শাহিন-হান্নানসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও কলেজের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন— সফলতার গল্প শুনিয়ে একটি প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলতে।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই আলোর আয়োজনকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। প্রোগ্রামটিকে “জামাত-শিবির-বিএনপির কর্মসূচি” আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়। এরপর তৎকালীন চেয়ারম্যান রুস্তম আলীর পুত্র সাইফুল ও তার লালিত সন্ত্রাসীরা ৫ জনকে পুলিশে ধরিয়ে দেয় এবং মিথ্যা মামলা দেয়।
মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়—এডভোকেট ইউসুফ আলম মাসুদ, প্রভাষক সাইফুল ইসলাম, কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সেলিম, ইমাম হোসেন এবং নাজমুল হোসেনকে।
শুধু এখানেই শেষ নয়—বাকি জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। ফুটবলের মতো লাথি, চড়, থাপ্পড় মেরে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয় তাদের। যারা এসেছিল পুরস্কার নিতে, যারা এসেছিল অনুপ্রেরণা পেতে— তারা ফিরে গিয়েছিল চোখে জল, শরীরে আঘাত আর মনে গভীর ক্ষত নিয়ে।
এমন নজিরবিহীন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় পুরো ফটিকছড়িতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অঙ্গন, শিক্ষিত সমাজ—সবাই ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল। কিন্তু কেউ সরাসরি প্রতিবাদ করার সাহস করেনি— তৎকালীন চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে। অথচ এই নির্মম ঘটনার আরেকটি নির্মম সত্য হলো— সেই প্রোগ্রামে ততকালীন চেয়ারম্যান পরিবারের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী, বর্তমান আরবি প্রভাষক সাইফুল ইসলাম। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তাকেও সাবেক চেয়ারম্যান রুস্তম আলী নির্মমভাবে কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে আহত করেন।
আরও হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা— সদ্য জিপিএ-৫ পেয়ে দাখিল উত্তীর্ণ কিশোর নুর মোহাম্মদ আতিক, যিনি রুস্তম চেয়ারম্যানেরই আত্মীয় একজন শিক্ষকের মাধ্যমে আমন্ত্রণ পেয়ে পুরস্কার নিতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। কিন্তু পুরস্কারের বদলে তিনি পান লাঠিপেটা। সেই সাথে অন্যান্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও আহত হয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যায়।
এখানে উল্লেখযোগ্য— সে সময়ের কুবির ছাত্র আয়োজকদের একজনের ভাষ্যমতে, এমন উদ্যোগের কথা চেয়ারম্যান ও তাঁর পুত্রকে আগেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা তা করতে নিষেধ করেছিলেন। তাই চিকনছড়ার পরিবর্তে তাকিয়াতে প্রোগ্রামটি আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের সাথে বনি-বনা না হওয়ার জেরেই যেন তৈরি হয় বাগানবাজারের এই নির্মম ইতিহাস।
সেদিন অনেকেই ভেবেছিল— গোঁড়ামি আর ভয়ের অন্ধকারেই হয়তো থেমে যাবে এই জনপদ। কিন্তু ইতিহাস এখানেই থেমে থাকেনি। কারণ এই প্রজন্ম থামার পাত্র নয়।
সেদিনের নির্মমতার শিকার সেই তরুণরাই আজ প্রতিষ্ঠিত। তাদের মধ্য থেকেই কিছু আলোকিত মুখের একান্ত প্রচেষ্টায় নতুন করে শুরু হয়েছে—বাগান বাজার শিক্ষা উন্নয়ন ফোরামের যাত্রা।
সেদিন ক্যাডার বাহিনীর হাতে মার খাওয়া সবচেয়ে জুনিয়র ছেলেটি, নুর মোহাম্মদ আতিক—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম শ্রেণীতে (বিএসএস ও এমএসএস) উত্তীর্ণ হয়ে আজ প্রজাতন্ত্রের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। এটাই সময়ের জবাব। এটাই প্রমাণ— স্বপ্নকে পেটানো যায়, কিন্তু হত্যা করা যায় না।
এ বিষয়ে ‘বাগানবাজার গ্রাফ-র প্রতিনিধি তার বর্তমান অভিমত জানতে চাইলে নুর মোহাম্মদ আতিক বলেন— “অতীতের কোন দুঃখজনক স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না। যারা সেসময়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে আমি আশাবাদী। ভবিষ্যতে বৈধ সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে বাগানবাজার শিক্ষা উন্নয়ন ফোরামের সাথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। কোন ব্যক্তিকে আমাদের মানবিক, শিক্ষামূলক কাজের প্রতিদ্বন্দ্বী আমরা মনে করি না। আমরা আলোকিত বাগানবাজার চাই।”
একই সাথে এড. ইউসুফ আলম মাসুদ বলেন— “ঐ দিনের ঘটনা হৃদয় বিদারক! ইউনিয়নের উচ্চ শিক্ষিত ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের উপর যে নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে তা স্বরণে আসলে এখনো লোম শিউরে ওঠে! ঐ ঘটনায় আমরা কয়েকজন জেলেও যেতে হয়েছে! তারপরও আমরা অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না! প্রতিশোধও নেবো না! বাগানবাজারে উচ্চ শিক্ষিতদের মূল্যায়ন কোনো কালে আমি দেখিনি! শিক্ষিত জেনারেশন দল-মত নির্বিশেষে মূল্যায়নের কথা না ভেবে এলাকার জন্য কাজ করতে হবে। শিক্ষিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে অটোমেটিক অনেক সমস্যার সমাধান হবে। আমাদের উচিত শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া। ”
এই বক্তব্যে নেই প্রতিশোধের আগুন—আছে মানবিকতা, আছে ভবিষ্যতের ডাক। তবুও ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা কোনো সমাধান নয়। সেদিনের অপমান আজকের শক্তি। সেদিনের ক্ষত আজকের প্রেরণা।
বাগান বাজার শিক্ষা উন্নয়ন ফোরাম তাই শুধু একটি সংগঠন নয়— এটি একটি প্রতিজ্ঞা, একটি প্রতিবাদ, একটি আলোকিত ভবিষ্যতের ঘোষণা।